বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ছোটগল্প:- অদ্ভুত আঁধার এক

আমি হইলাম দালাল। না না, দালাল বইলা নিজেরে ছোড মনে করি ন্যা। এইটা আমার পেশা। চুরি করা যেমনে পেশা, আমারডাও পেশা। যদিও আমি মাগীগো দালালী করি। তয় নিজে কহনও মাগীগো লগে থাহি না। আমি হইলাম মোবাইল-টেলিফুনের মতন। খালি লাইন লাগাই দেই। বিল নিয়াই খালাস।
আমার নামডা পচা গুয়ের মতন অয়ে গ্যাছে। কেউ নাম ধইরা ডাহে না। আমিও মানাই নিছি।
আব্বা, আব্বা। মায়াডা আমারে ডাকতেছে। ওর ডাক হুনলে আমার পরানডা জুরায় যায়। মন-কয় ওরে নিয়া উড়াল মাইরা অন্য দ্যাশে চইলা যাই।
আইতেছি, মা। বইলা ঘর থন বাইর অইলাম। মাঝের দুয়ারডা ছোড। তয় বালাই অইছে, ঝাড়ু-টাড়ু দেওন কষ্ট অইত। এহন ইচ্ছা অইলে দেই, না অইলে দেই না।
মায়াডার নাম নাসরিন। ওর মায় নাম রাখছিল। আমি দিসিলাম মরিয়ম। মা মরিয়মের নামের সাথে মিলায়া। তয় ওর মা মরনের পর নাসরিন কইয়াই ডাকি।
ড্রেস পরা অইছেরে, মা? আমি পরীডাকে দেখতে থাহি। ওরে পরীগো চ্যায়া সুন্দর মনে অয়। পরীরা দেখতে কিমুন? জানি না। জাননের দরকারও নাই। কবিতা হুনছিলাম এক ভদ্র মাইনসের কাছে, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, পৃথিবীর মুখ দেখিতে চাই না। আমিও আমার মায়াডার মুখ দেখিয়াছি, পরীগো মুখ দেখিতে চাই না।
হ, আব্বা। যাই চল। বইলা আমার হাতখান ধরল। আমি রেডিই আছিলাম, তাই তারে নিয়া বাইরে দাঁড় করাইয়া ঘরে তালা মারলাম। বস্তিডা বালাই। কেতন বাইকে বইলা, আমি দুয়ার সহ ঘর নিছি। অবশ্য টেকাও নিছে। হে টেকা ছাড়া কাম করে না। মাঝে-মধ্যে আমার কাছে আহে। বলে, কিরে আছে নাকি?
টেকা বেশি লাগব, বাই।
তুই বড়ই চালাক। দুর্বলতা বুঝোস। কত লাগব, ক?
১০০০ টেকা।   
কস কি? এত ক্যান?
বাই, কমে রাজি অয় না। বুঝেনই তো। মাল ভাল।
দূর, তোর মালেরে আমি চুদি।
বইক্যা লাভ নাই, বাই।
আইচ্ছা, বইল্যা রাখিস, আমি সন্ধ্যায় আসুমনে। কই আসুম ক?
জানামুনি ফুন দিয়া।

মায়াডা নিয়া বের অইলাম। দুইজনে হাঁটতেছি। ভিতরডা আইজ খুব ভাল লাগতেছে। মায়াডা স্কুলের মধ্যে ফাস্ট। গর্বে আমার চোক্ষে পানি আইতেছে। কেন আহে কেডা জানে? হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের সামনে চইলা  আসলাম।
তুমি, যাইতে পারবা না ক্লাসে। বইলা আমি ওর হাত দরলাম। আরো ভাল মতন পড়বা, মা। তোমারে শিক্ষক অইতে অইব। আর শিক্ষক অইতে বেশি বেশি জানন লাগব। বুজছ?
হ, আব্বা। আমি অমুই। বইলা স্কুলে ঢুইক্যা যায়। আমি ওর হাঁটা দেখি। কি যে সুন্দর কইরা হাঁটে। এক মুহূর্তও ওরে ছাইড়া থাকতে মন চায় না। কি করুম, কাম তো করনই লাগব।
টং দোকানে বইসা আছি। হাতে একটা চায়ের কাপ। চাতে চুমুক দিয়া আইজ স্বাদ পাইলাম না। তিতা তিতা লাগল।
বাই, চা তিতা ক্যান?
কন কি? তিতা অইব ক্যান?
আপনে বানাইছেন। আপনেই জানেন।
পাশ থিকা একজন বইলা উঠে, ভাই আমার কাছে মিষ্টি চা আছে, খাবেন। মনে অইল ভদ্রলোক। কিন্তু চায় তো চোরের মত। আমি কিছু কইলাম না। দেখি আরো একজন আইছে। আমার দিকে তাকায় আছে। দামী একখান সেট বাইর কইরা কারে য্যান কল দিতাছে। শালায় ভাব ধরে কি, আমার কাছেও সামসাং সেট। ছয় আজার দিয়া কিনছিলাম। চোরাই মাল। শামীম দিসিল। একদিন আমার বাড়িতে আইসা কইল, ভাই, আপনে না একটা সেট চাইছিলেন?
আমি কইলাম, হ। বেচনের মত আছে নি?
এই যে দেখেন। আমার হাতে ধরায় দিল। সেট দেইখাতো চয়েজ অইয়া গেল। কইলাম, কত নিবি?
১৫০০০ আজার।
আনছোস চুরি কইরা। আবার কস ১৫০০০।
চুরি করতে কষ্ট আছে। সবসময় খালি ভয়। আমার চার-পাশে মাইর ঘুরে।
মাইর ঘুরে মানে?
বুঝলেন না, ভাই। ধরা খাইলেই তো পাবলিকের পিটানী। অবশ্য পুলিশের কাছে ধরা খাইলে বেশি পিটানী খাই না। একবার অইল কি, হাতে-নাতে খাইলাম ধরা। পাবলিক তো চেতা। কুত্তার মত চেতছে সবাই, আমারে মাইরা ফালাইব। তহন দেহি পুলিশ। আমি মনে মনে ব্যাপক খুশি অইলাম। পুলিশ আইসা কইল, হইছে হইছে, আপনারা যান, ব্যাপারটা আমরা দেখতাছি। সবাই গেলগা। আমারে গাড়িতে উঠায়া দিল আট-নয়টা বাড়ি। এই বাড়ি হজম করন গ্যাছে, মাগার পাবলিকের মাইর হজম করা সোজা না। তারপর আমারে কইল, কত আছে। পকেটে যা ছিল দিলাম দিয়া। কইল, এক দৌড়ে এলাকা ছাড়বি। তাই করলাম। দেখছেন কত কষ্টের।
৬০০০ দিমু। কতা কইস না।
দেন। আপনে বড় ভাই।
চায়ের টেকা শোধ কইরা দিয়া বের হইতে যামু, তহন ভাবওয়ালা আমার সামনে দাঁড়াইল। আমি কইলাম, বাই সাইট দ্যান তো, বাইর হমু?
তোমারে বাইর করতেছি, সোনা। এই কতা হুইনা আমার রক্ত পানি অইয়া গেল। এমুন কতা তো পুলিশে কয়। হালারা কি আমারে ধরতেই এইহানে আইছিল। আমি সুন্দর মতন কইলাম, এমনে কতা কন ক্যান?
কেমনে বললে তুমি খুশি হবা?
আমারে যাইতে দ্যান। কইতে কইতে দেহি শালার পুলিশের গাড়ি আইসা পড়ছে। দৌড়ও দেওন যায় না। বুদাই-এর মত দাঁড়ায়া রইলাম। হেরা আইসা আমারে গাড়িতে উঠায় নিল।
এহন থানার ভিতর বইসা আছি। কি গরম? ফ্যান বন্ধ। সরকারী মাল এমুনই। সব নষ্ট থাহে। ভিতরে আরেকজন বইসা রইসে। আমি আলাপ জমাইতে চাইলাম।
নাম কি বাই?
নাম দিয়া কাম কি, তোর কাজ কর।
আমার কোন কাজ নাই।
এই যে নে পাথর, মেঝেতে কবিতা লেখ।
আমি লেকতে পারি না।
তাইলে চুপ কর। মাথা ফাটায় দিমু।
আপনে জেলে ক্যান, বাই?
মাথা ফাটায় দিুম। আমি কিছু কইলাম না। বাল-সাল পাগল-ছাগল জেলে আইনা ভরছে। এইহানে সুস্থ মানুষ থাকব কেমনে? মায়াডার কতা মনে পইড়া গেল। স্কুল ছুটি দিলে ও বাড়ি যাইব কেমনে। চিন্তা বাড়তে লাগল। আমারে যদি না ছাড়ে। কি অইব?
পুলিশ বাই, পুলিশ বাই। আছেন নি কেউ?
চুপ কর।
বাই, এট্টু হুনেন। আমার মায়াডা স্কুলে, ছুটি দিব, এট্টু পর। আমারে যাইতে দ্যান না। ও বাড়ি চিনে না।
একজন সামনে এসে বলল, যাইতে দিব। আগে বল, তোমার দলে কে কে আছে?
আমি পলিটিকস করি না।
চালাকির চেষ্টা করবা না। আমরা সবাই জানি। তুমি দালালি কর। কিসের দালালিও সেটাও জানি।
আমি সব কমু বাই, আমার মায়াডারে বাড়ি পৌছায় দিতে দ্যান। কেউ আমারে নিয়ে যান, সঙ্গে কইরা।
হ, তারপর পালাও। তোমার মেয়ের কিছু হইব না। বল?
আমি একলাই। দলে কেউ নাই।
সত্যি তো।
হ, স্যার। সত্যি।
তাইলে তুমি এখন স্বীকার করলা? বইলা লোকটা চইলা গেল। আমি চাইয়া রইলাম সেই দিকে। স্বীকার না কইরা উপায় নাই। সত্যিডাই কইয়া দিসি। এহন যা অইবার অইব। কেতন বাই ছাড়াইতে আসতে পারে। হের সাথে সন্ধ্যায় দেখা করনের কতা। এক আজার টেকা নিসি।
মায়াডার স্কুল ছুটি অইয়া গ্যাছে। কি করতেছে, কেডা জানে? ও তো বাড়ি চিনে না। আমি আবার পুলিশরে ডাকলাম। কেউ টু-শব্দ করল না। অস্থির লাগা শুরু করল। কি করুম, বাইবা পাই না। সেটও নিয়া গ্যাছে। বইসা পড়লাম। পাছায় ঠান্ডা মেঝে, মাথায় গরম ব্রেন। এইহানে বইসা কিছু করনের ক্ষমতা কারো নাই। একজন পুলিশরে দেখলাম, পুলিশ বাই। আমার মায়াডা যাইতে পারব না। আপনেরা কেউ আমার সাথে যান, ওরে ওর খালার কাছে রাইখা আসি। কাছেই বাড়ি। কিছু না্ কইয়া হে চইলা গেল।
আধঘন্টা পর, একজন আইসা আমারে কইল, তুই দালাল?
হ। হে হাসতে শুরু করল। আমি কইলাম, হাসেন ক্যা?
এমনেই। তোর ভাগ্য ভাল। কত মাগীগো সাথে শুইসোস।
না, বাই। আমি দালাল ঠিকাছে, এই কাম করি নাই। স্ত্রীরে খুব ভালবাসতাম।
তাই। মিলি নামের মেয়েটাকে কে খুন করছে?
আমি কি জানি? আমার মায়াডারে স্কুল থাইকা বাড়ি দিয়া আসা দরকার।
কে খুন করছে?
বাই, বিশ্বাস করেন, আমি করি নাই। ওর খবর আমি জানি ন্যা। আমার মায়াডা…..
কে খুন করছে? আমারে থামাইয়া আবার কইল।
বাই, আমি করছি, আমি। আমার মায়াডারে ওর খালার বাসায় দিয়া আসতে দ্যান। সব আমি করছি, আমার চোক্ষে পানি আসল আবার।
খানকির পোলায় চইলা গেল। হাতির মতন পা ফালায় গেল, দম দম কইরা উঠল মেঝে। আমার ভিতরডা ফাইটা যাইতেছে। পরীডা কি করতেছে, কেডা জানে? শরীর ঘামে জবজব করতেছে।
পুলিশ আবার আইল। চল, তোমার মেয়েকে বাড়ি দিয়ে আসো। তুমি তো সব স্বীকারই করস?
আমারে সেল থিকা বাইর কইরা গাড়িতে উঠাইল। গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি চলতে শুরু কইরা দিল। মনের ভিতর কেমুন কেমুন করতেছে। মায়াডা কি ঠিক আছে। যদি একলা একলা রাস্তায় বাইর অয়, তাইলে কি অইব? ভাবতেই পারলাম না, সেই দৃশ্য। মাথায় মায়াডার মুখ। কি সুন্দর মুখ! এত সুন্দর কাউরে আমি দেহি নাই।
হঠাৎ কইরা একজন পুলিশ আইসা আমার চোখ বাইন্ধ্যা ফালাইল। আমি কইলাম, করেন কি? স্কুলে যাইত চোখ বান্দেন ক্যা?
চুপ থাক। আমি চুপ কইরা থাকলাম। চুপ কইরাই আছি। জিগাইলাম, স্কুলে আইছি? কেউ উত্তর দিল না। মনডা আরো খারাপ অয়ে গেল। বুঝতেছি না, কি অইব?
অনেক সময় পরে আমারে গাড়ি থিকা নামাইল। একজন কইল, দাঁড়া এইহানে। আমি দাঁড়াইলাম। আর কইলাম, আমার মায়াডারে স্কুল থন বাড়ি দিয়া আসা দরকার।

পুট্টুস কইরা কপালে য্যান কি বিন্ধ্যা গেল।